দুর্নীতির হিমশৈল: ওসি ফারুকের স্ফীত সম্পদ ও সন্দিগ্ধ পদায়ন! | তদন্ত রিপোর্ট

বৃহস্পতিবার, ১৬ Jul ২০২৬, ০৮:১৭ অপরাহ্ন

দুর্নীতির হিমশৈল: ওসি ফারুকের স্ফীত সম্পদ ও সন্দিগ্ধ পদায়ন!

দুর্নীতির হিমশৈল: ওসি ফারুকের স্ফীত সম্পদ ও সন্দিগ্ধ পদায়ন!

Manual4 Ad Code

মোঃ রায়হান হোসেন: রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন আইনের শাসন পর্যবসিত হয় নিছক প্রহসনে। বাংলাদেশ পুলিশের পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. ওমর ফারুকের মাত্র চৌদ্দ বছরের চাকরিজীবন যেন সেই প্রবাদেরই এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি। ২০১১ সালে উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে চাকরিতে যোগদান করে বিগত সরকারের ছত্রছায়ায় ক্ষমতার চরম অপব্যবহার ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের এক বিশাল ও অবৈধ সাম্রাজ্য।

Manual3 Ad Code

সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকা গোয়াইনঘাট থানায় তার পুনর্বহাল স্থানীয় জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। অনুসন্ধানী তথ্য ও সরেজমিন প্রতিবেদনে ওসি ওমর ফারুকের যে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের সন্ধান মিলেছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। তার দুর্নীতির শেকড় কতটা গভীরে প্রোথিত, তা এই সম্পদের বিস্তৃতি। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত দরগাহ মহল্লার শাহজালাল টাওয়ারে (অষ্টম তলা, ফ্ল্যাট এ/৩) কলেজ শিক্ষক স্ত্রী উম্মুল খায়ের মাকসুরার নামে তিনি একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। ২৩০০ বর্গফুটের এই ফ্ল্যাটটির প্রতি বর্গফুটের মূল্য ৫ হাজার টাকা হিসেবে শুধু মূল দামই দাঁড়ায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। দলিল রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ভার মিলিয়ে এর বর্তমান বাজারমূল্য দেড় কোটি টাকারও ঊর্ধ্বগামী।

Manual2 Ad Code

টাওয়ারের নিরাপত্তা কর্মীদের তথ্যমতে, গত কয়েক বছর ধরে সপরিবারে তারা এই ফ্ল্যাটেই নিরবচ্ছিন্নভাবে বসবাস করছেন। সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা সদরে তিনি একটি সুদৃশ্য ও ব্যয়বহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া নিজ জন্মস্থান মৌলভীবাজারের রাজনগরেও তার নামে-বেনামে রয়েছে সুবিশাল জমিজমার নিরঙ্কুশ মালিকানা। প্রাপ্ত তথ্যমতে, সিলেটের গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর থানায় কর্মরত থাকাকালীন সময়ে চোরাকারবারি ও অবৈধ সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশেই মূলত তিনি এই বিপুল অর্থবিত্তের মালিকানা অর্জন করেন। রাজনৈতিক মেরুকরণ ও রহস্যময় পদায়ন পেশাগত উৎকর্ষ বা সততার পরিবর্তে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিই ছিল তার পদোন্নতি ও লোভনীয় পোস্টিংয়ের মূল হাতিয়ার।

Manual6 Ad Code

বিগত ক্ষমতাসীন দলের শাসনামলে বিতর্কিত ‘রাতের নির্বাচন’-এর ঠিক প্রাক্কালে তাকে কুলাউড়া থানা থেকে সরিয়ে আকস্মিকভাবে সিলেটের বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে পদায়ন করা হয়। এই ত্বরিত ও অদৃশ্য কারণনির্ভর বদলি প্রমাণ করে যে, তিনি মূলত একটি বিশেষ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুনিপুণ ক্রীড়নক হিসেবেই কাজ করেছেন। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি (জাফলং, বিছনাকান্দি, রাতারগুল) নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মানদণ্ডে একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর সীমান্ত অঞ্চল। অতীতে এই থানায় পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ওমর ফারুককে পুনরায় মূল ওসি হিসেবে বদলি করে আনার সিদ্ধান্তে পুরো উপজেলা জুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া। স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের মনে উত্থিত হচ্ছে কিছু যৌক্তিক ও কঠিন প্রশ্ন? গোয়াইনঘাট থানা কি দুর্নীতিবাজদের জন্য কোনো চিরস্থায়ী অভয়ারণ্য? বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে কি সৎ, যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তার এমন আকাল পড়েছে যে, বারবার একই বিতর্কিত মুখগুলোকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এই চেয়ারে বসাতে হবে? এর নেপথ্যে কি অদৃশ্য কোনো রাজনৈতিক বা বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক লেনদেন ক্রিয়াশীল? গোয়াইনঘাট দীর্ঘকাল ধরে পাথর কোয়ারি, বালু মহাল এবং সীমান্ত চোরাচালানের তীর্থস্থান হিসেবে সমালোচিত।

Manual7 Ad Code

অতীতে যারা এখানে দায়িত্ব পালন করেছেন, স্থানীয় বালু-পাথর খেকো মাফিয়া ও চোরাচালান চক্রের সঙ্গে তাদের একটি অলিখিত ও সুগভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে। ওমর ফারুকের এই প্রত্যাবর্তনের অর্থ স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট— এটি সেই পুরোনো ও ভয়ংকর সিন্ডিকেটগুলোরই নবরূপে পুনর্বাসন। এর ফলে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চরম হুমকির সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা হলো আইনি সেবার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা। কিন্তু একজন বিতর্কিত কর্মকর্তা যখন পূর্বের কর্মস্থলে ফিরে আসেন, তখন তার অতীত সম্পর্ক ও বাধ্যবাধকতাগুলো নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষ আশঙ্কা করছেন, এর ফলে আইনি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হতে হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে, যা পুলিশের প্রতি জনমানসের অবশিষ্ট আস্থাকেও সমূলে বিনাশ করবে। গোয়াইনঘাটের আপামর জনসাধারণের দাবি অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ও দ্বিধাহীন কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের আধিপত্য তারা আর মেনে নিতে প্রস্তুত নন। সীমান্ত চোরাচালান, মাদকের বিষবাষ্প এবং অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন সমূলে উৎপাটন করতে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত, নতুন ও সৎ একজন পুলিশ কর্মকর্তার পদায়ন অপরিহার্য। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি স্থানীয়দের এটি কেবল একটি আবেদন নয়, বরং একটি সতর্কবার্তাও বটে। সময় থাকতে এই ক্ষোভের মূল্যায়ন না করা হলে গোয়াইনঘাট অচিরেই অপরাধীদের এক অপ্রতিরোধ্য চারণভূমিতে পরিণত হবে।

উল্লিখিত অভিযোগ ও বিতর্কিত পদায়নের বিষয়ে ওসি মো. ওমর ফারুকের ব্যবহৃত সরকারি সেলফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি, ফলে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এই প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code
error: Content is protected !!